রাজা সীতারাম রায় ও রাজধানী মহম্মদপুর

রাজা সীতারাম রায় (১৬৫৮–অক্টোবর ১৭১৪) ছিলেন প্রারম্ভে মোগল শাসনের অধীনে জমিদার; পরে তার নিজস্ব সামরিক শক্তি ও প্রশাসন গড়ে তোলেন এবং দক্ষিণ-বঙ্গের কিছু তালুক ও পারগণায় স্বল্পকালীন একটি স্বাধীন রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মহম্মদপুর (বর্তমান মাগুরার একটি উপজেলা) কে তাঁর রাজধানী করেন এবং সেখানে দূর্গ, প্রাসাদ, মন্দির ও বড় পানিসম্পদ নির্মাণ করে একটি সজীব নগর দাঁড় করান।

ব্যক্তিগত তথ্যসংক্ষেপ
▪️পূর্ণ নামঃ সীতারাম দাস (পরে রাজা সীতারাম রায় নামে পরিচিত)
▪️পিতাঃ উদয়ন নারায়ণ দাস
▪️মাতাঃ দয়াময়ী ঘোষ
▪️স্ত্রীঃ শ্রী, কমলা
▪️জন্মঃ ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ, মহাপতিপুর, কাটোয়া, বাংলা (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম-বর্ধমান অঞ্চল)
▪️পরিচিতিঃ বাংলার বারোভূঁইয়ার শেষ যুগের অন্যতম প্রতাপশালী রাজা ও জমিদার
▪️মৃত্যঃ অক্টোবর, ১৭১৪ খ্রিস্টাব্দ; মৃত্যু নিয়ে দুইটি তথ্য পাওয়া যায়। এক, মুর্শিদাবাদে মোগল প্রশাসনের হেফাজতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অবস্থায়। দুই, আত্মসমর্পণ না করে, রাজা তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এক নৌকায় উঠে ‘রামসাগর’ হ্রদের জলে আত্মবিসর্জন দেন।


রাজা সীতারাম রায় ছিলেন বাংলার ইতিহাসে এক অনন্য প্রতাপশালী ও সাহসী শাসক। তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বল্প সময়ের জন্য বাংলায় একটি স্বাধীন হিন্দু রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর রাজধানী স্থাপিত হয় বর্তমান মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুরে, যেখানে তিনি একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন এবং ধর্মীয় শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে দশভূজা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

ইতিহাস অনুযায়ী, সীতারাম উত্তরাধিকারসূত্রে ১৭শ শতাব্দীতে ভূষণার অন্তর্গত একটি ক্ষুদ্র রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। ভূষণা ছিল তৎকালীন ফতেহাবাদ এবং বর্তমান ফরিদপুর জেলার একাংশ নিয়ে গঠিত একটি বৃহৎ পরগণা। সেই সময় করিম খান নামে এক পাঠান বিদ্রোহী এলাকাজুড়ে ভয়াবহ তাণ্ডব চালাচ্ছিল। মুঘল ফৌজদার ব্যর্থ হলে শায়েস্তা খান নতুন পরিকল্পনার কথা ভাবছিলেন। এই সময় সীতারাম নিজে বিদ্রোহ দমন করার প্রস্তাব দেন। মুঘল প্রশাসন তাঁকে পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনীসহ অভিযানে পাঠায়। বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ে করিম খান নিহত হলে শায়েস্তা খান সীতারামের সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নলদী পরগণার জায়গীর দান করেন।

মগ-জলদস্যু ও পাঠান বিদ্রোহীদের দমন করে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য সীতারাম ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত হন। পরবর্তীতে ভূষণার বিভিন্ন ভৌমিক রাজারা কর প্রদানে অবহেলা করতে শুরু করলে শায়েস্তা খানের নির্দেশে সীতারাম মোহাম্মদপুরে আসেন এবং ধীরে ধীরে সমগ্র ভূষণা পরগণাকে তাঁর নিয়ন্ত্রণে আনেন। বিদ্রোহী জলদস্যুরাও তাঁর বীরত্ব ও নেতৃত্বে মুগ্ধ হয়ে তাঁর সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়, ফলে তাঁর সামরিক শক্তি আরও বৃদ্ধি পায়।

রাজা সীতারাম মোহাম্মদপুরকে তাঁর রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন। তিনি ন্যায়বিচার, প্রশাসন ও জনকল্যাণমূলক কাজে মনোনিবেশ করেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার উন্নতির জন্য তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টা তাঁকে দ্রুতই প্রজাদের কাছে প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় শাসকে পরিণত করে। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি একটি স্বাধীন হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন এবং প্রতিরক্ষার জন্য বিভিন্ন দুর্গ নির্মাণ করেন। এই পদক্ষেপ মুঘল শাসকদের উদ্বিগ্ন করে তোলে।

পরবর্তীতে মুর্শিদ কুলি খান কর আদায়ের জন্য আবু তোরাবকে সীতারামের দরবারে পাঠান। কিন্তু সীতারামের সেনাপতি মোনাহাতীর সঙ্গে যুদ্ধে আবু তোরাব নিহত হন। এই ঘটনার পর সীতারাম মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলেও রাজধানী রক্ষার জন্য বক্স আলী খান ও দোয়ারামের নেতৃত্বে সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি যুদ্ধে পরাজিত হন। তার মৃত্যু নিয়ে দুইটি তথ্য পাওয়া যায়। এক, আত্মসমর্পণ না করে, রাজা তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এক নৌকায় উঠে ‘রামসাগর’ হ্রদের জলে আত্মবিসর্জন দেন। দুই, মুর্শিদ কুলি খান (বা মুর্শিদাবাদের প্রভাবশালী মোগল নেতারা)–এর প্রশাসনিক ও সামরিক উদ্যোগের মুখে ১৭১৪ সালে সীতারাম আটক হন এবং মুর্শিদাবাদে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত হন।

তাঁর রাজত্বকালে জনকল্যাণের লক্ষ্যে খনন করা ‘দুধসাগর’, ‘কৃষ্ণসাগর’, ‘সুখসাগর’ ও ‘শ্বেতসাগর’-এর মতো বৃহৎ পুকুরগুলো একসময় সাধারণ মানুষের পানির উৎস ছিল, যা পরবর্তীতে মধুমতি নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। তবুও আজও ‘কাছারিবাড়ি’, ‘দোলমঞ্চ’ ও ‘পদ্মপুকুর’ তাঁর শাসনামলের স্মৃতি বহন করে দাঁড়িয়ে আছে—রাজা সীতারাম রায়ের বীরত্ব, ন্যায়পরায়ণতা ও আত্মত্যাগের নিঃশব্দ সাক্ষী হিসেবে।

মহম্মদপুর ও অন্যান্য নামকরণ
রাজধানীর নামকরণের ব্যাপারে একাধিক মত আছে। কেউ মনে করে স্থানীয় মুসলিম ফকির মোহাম্মদ শাহের নামানুসারে তার রাজধানীর পুরাতন নাম বাগজান এর স্থলে মহম্মদপুর নামকরণ করেন।আবার কেউ মনে করেন সূফীসাধক মুহম্মদ আলী শাহ এর নামানুসারে সীতারাম রায় রাজধানীর নাম মহম্মদপুর রাখেন। অবশ্য মহম্মদপুর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে বড়রিয়া গ্রামে আলী মাওলার দরগাহ ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হিসেবে অদ্যাবধি বিদ্যমান। আবার কেউ কেউ মনে করেন ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠ প্রচারক মহানবী হযরত মুহম্মদ এর নামানুসারেই সীতারাম তার মুসলমান প্রজাদের মনোরঞ্জনের জন্য রাজধানীর নাম ‘মহম্মদপুর’ রাখেন।

সীতারামের একজন সেনাপতি শিবরাম চক্রবর্তীর নামানুসারে মাগুরা শহরের অদূরে ‘শিবরামপুর’ গ্রাম অবস্থিত।

সীতারাম রায়ের প্রথম স্ত্রীর নাম ছিল- শ্রী।
‘শ্রী’ থেকেই ‘শ্রীপুর’ (উপজেলা) নামকরণ হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। মহম্মদপুর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দুরে বালিদিয়া ইউনিয়নভূক্ত ‘শ্রীপুর’ নামে একটি গ্রামও রয়েছে। মাগুরা জেলায় আরও একাধিক ‘শ্রীপুর’ নামের গ্রামের অস্তিত্ব বিদ্যমান। অনেকের মতে, সীতারামের স্ত্রী ‘শ্রী’-র নামানুসারেই এই গ্রামগুলির নামকরণ করা হয়েছে।

মহম্মদপুর — রাজধানী ও স্থাপত্য
রাজধানী: রাজা সীতারামের কেন্দ্রটি ছিলেন মহম্মদপুর (মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলা), যা মধুমতী নদীর তীরে—এখানেই তিনি তার প্রাসাদ ও দুর্গ নির্মাণ করেন। মহম্মদপুরের দুর্গটি প্রাকৃতিক জলাশয় ও খালের দ্বারা তিনদিকে ঘিরা ছিল; ভিতরে প্রাসাদ, গোরস্থালিসহ মন্দির, বড় ট্যাংক (ট্যাঙ্ক/বড় পুকুর) নির্মাণ করা হয়। সবচেয়ে বিখ্যাত পানিসম্পদ ছিল — রামসাগর (Ram Sagar) — যা নগরবাসীর পানি ও সুরক্ষার জন্য খনন করা হয়েছিল।

মহম্মদপুরে আজ যেসব নিদর্শন লক্ষ্য করা যায়
রাজপ্রাসাদ/কাছারী বাড়ি (Palace / Kachari Bari) — প্রাসাদ আধুনিককালে আংশিক خرابی সত্ত্বেও অনুরূপ দেয়াল, গম্বুজ ও আর্চযুক্ত অডিটোরিয়াম ধাঁচে আজও দেখা যায়; জায়গাটি আর্কিওলজিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ। মহম্মদপুর উপজেলার ট্যুরিস্ট পেজ এবং স্থানীয় রিস্টোরেশন রিপোর্টে প্রাসাদের বর্তমান অবস্থা ও সাম্প্রতিক সংস্কারের কথা বলা আছে।
ট্যাংক/পুকুর (যেমন রামসাগর) — রাজা সীতারাম নগরপালন ও জলসংরক্ষণের জন্য বড় পুকুর খনন করিয়েছেন; এগুলোর অবশিষ্টাংশ ও স্থানীয় স্মৃতিবাহী নামাবলি দৃশ্যমান।

পতিত মণ্ডপ/মন্দিরবিতান ও দুর্গের ভিত্তি — প্রাসাদের আশপাশে মন্দির, গারহস্থ্য স্থাপত্য ও দুর্গের ভিত্তি/খোঁজ পাওয়া যায়; কিছু অংশ পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করা হয়েছে।

উপসংহার
রাজা সীতারাম রায় ছিলেন দক্ষিণ-বঙ্গে স্থানীয় শক্তি ও অসীম সাহসিকতার প্রতীক; তিনি মহম্মদপুরে একটি রাজধানী স্থাপন করে অঞ্চলটিকে আর্কিটেকচারাল ও সামাজিকভাবে সমৃদ্ধ করেন। তার রাজত্বের ক্রমবিকাশ, মোগল-সরকারের সঙ্গে সংঘাত ও অবশেষে ধরা-পড়ার কাহিনী—সবকিছুই ১৭শ শতাব্দীর প্রান্তবর্তী বাংলার জটিল রাজনীতির দৃষ্টান্ত। মহম্মদপুরে আজও তার প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ, ট্যাংক ও স্থানীয় স্মৃতিস্তম্ভ দর্শনার্থীদের জন্য ইতিহাস-ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

▪️লেখক
শিমুল পারভেজ 
সম্পাদক, পজিটিভ নহাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *